অনুমোদনহীন কয়েলের দৌরাত্ম্য

AUTHOR: durnitirsondhane
POSTED: রবিবার ৩ নভেম্বর ২০১৯at ১:২৪ অপরাহ্ণ
65 Views

স্টাফ রিপোর্টার : স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর মাত্রার রাসায়নিক মিশিয়ে কয়েল উৎপাদন করছে অনুমোদনহীন কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব কয়েল ব্যবহারে আপাতদৃষ্টিতে ‘কার্যকর ফল’ পাওয়ায় ক্রেতারা এমন ক্ষতিকর কয়েলের দিকেই ঝুঁকছেন। অনুমোদনহীন ও ক্ষতিকারক এসব কয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে মার খাচ্ছে পরিমিত মাত্রায় রাসায়নিক মিশিয়ে কয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। দেড় হাজার কোটি টাকার কয়েলের বাজারে মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল ৫৫ শতাংশ থেকে নামতে নামতে এখন ১২ শতাংশে এসে ঠেকেছে। দিন দিন তা আরও কমছে; ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো।

বিশ্ববিখ্যাত মরটিন মশার কয়েল নির্মাণ প্রতিষ্ঠান রেকিট অ্যান্ড বেনকিজার গত বছর তাদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। উৎপাদন বন্ধ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই। এ ছাড়া ভারতীয় প্রতিষ্ঠান গোদরেজের গুডনাইট, কাজী এন্টারপ্রাইজের ঈগল, গ্লোবসহ আরও কয়েকটি ব্র্যান্ড এখন আর কয়েল উৎপাদন করছে না বলে জানিয়েছেন এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে অখ্যাত ১৪টি ব্র্যান্ডের মশার কয়েল ভারতে পাঠানো হয় পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এসব কয়েলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ১৪ গুণ বেশি। আইন অনুযায়ী, একটি রাসায়নিক ব্যবহারের কথা থাকলেও মেশানো হচ্ছে চারটি পর্যন্ত। এর আগে ২০১৫ সালে জাপানের সুমিতমো কেমিক্যালে ২৪টি কয়েলের নমুনা পাঠানো হয়েছিল পরীক্ষার জন্য। তাতেও নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি হারে এবং আইন ভেঙে একাধিক রাসায়নিক ব্যবহারের চিত্র পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে এসিআই কনজু্যুমার ব্র্যান্ডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলমগীর বলেন, কয়েলের বাজারে এখন দুষ্টুদের রাজত্ব চলছে। আমরা চাইলেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কয়েল উৎপাদন করে বাজারে ছাড়তে পারি না। তাই উৎপাদনই বন্ধ করে দিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের অনেক নিয়ম মানতে হয়; কর দিতে হয়। ওই সব কারখানার ক্ষেত্রে তো কিছুই লাগে না। সরকার দেখুক, এ খাত থেকে আগে কত কর আদায় হতো, এখন কত আসে। তিনি বলেন, কয়েলের ব্যবসা ধরে রাখতে বিদেশি খ্যাতনামা কোনো ব্র্যান্ড অনৈতিক ও বেআইনি কাজ করে নিজেদের সুনামের ক্ষতি করবে না।

জানা গেছে, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অপরিমিত মাত্রার রাসায়নিক মিশিয়ে যে কয়েলগুলো তৈরি হয়, এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ কারখানাই গড়ে উঠেছে যাত্রাবাড়ী, টঙ্গী, ভৈরব, নারায়ণগঞ্জ, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায়। ঘরে ঘরে গড়ে ওঠা এসব কারখানার কোনো পরীক্ষাগার নেই, নেই কোনো রসায়নবিদ। অখ্যাত ক্ষতিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘তুলসী পাতা’ রাজধানীতে বেশি বিক্রি হতে দেখা যায়। উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের আমজাদ এর নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ছাড়া বিমানবন্দরের নূরাণী কয়েলের ডিলার মজিদ, দক্ষিণখানের সম্রাট কয়েলের ডিলার আতিকুর রহমান আতিক, সুপার সানের মালিক জুয়েল মিয়া, ফ্যামিলি ও অ্যাটাকিং কয়েল উৎপাদিত হয় উত্তরার আনোয়ারা মডেল কলেজের পিছনে, যার ডিলার মোজাম্মেল হক। উত্তরখান উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে তৈরি হয় ড্রাগন ও ড্রাগন হেড কয়েল। এ ছাড়া শনিরআখড়া, রায়েরবাগ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অনেকেই মানহীন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মশার কয়েল উৎপাদন করছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের কয়েলের বাজারের আকার প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের দখলে ছিল ৫৫ শতাংশেরও বেশি বাজার। এখন সেটা কমে ১২-১৩ শতাংশে নেমেছে। মূলত ২০১২ সালের দিকে প্রথমে চীন থেকে অনুমোদনহীন বিপুল পরিমাণ কয়েল দেশের বাজারে আসা শুরু হয়। এরও পরে দেশেই গড়ে ওঠে শত শত কারখানা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কীটনাশক ও এর ব্যবহার শীর্ষক নির্দেশনায় মশার কয়েলে ছয়টি রাসায়নিক সর্বোচ্চ কি পরিমাণ ব্যবহার করা যেতে পারে, তা সুনির্দিষ্ট করা আছে। এতে দেখা গেছে, শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৩ মাত্রা পর্যন্ত সক্রিয় কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এ মাত্রার কীটনাশকেই মশা পালিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু অবৈধ প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে অতিরিক্ত মাত্রায় কীটনাশক মেশাচ্ছে। এতে মশাসহ বিভিন্ন পোকামাকড়, তেলাপোকা, এমনকি টিকটিকিও মারা যাচ্ছে। আর নিঃশ্বাসে বিষাক্ত ধোঁয়া গ্রহণে মানবদেহেও নানা রকম রোগ বাসা বাঁধছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, কয়েল মশা তাড়ানোর জন্য, মারার জন্য নয়। এতে কী মাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগ হবে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমদানিকৃত এবং নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত কয়েলে রাসায়নিক দেওয়া হয় হিসাব-নিকাশ ছাড়া; যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

দেশীয় আইনে মশার কয়েল উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কয়েলের নমুনা পরীক্ষা করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ‘পাবলিক হেলথ প্রোডাক্ট’ (পিএইচপি) হিসেবে অনুমোদন দেবে এবং এর একটি নম্বর দেবে। এর পর পিএইচপি কাগজপত্র দেখে বিএসটিআই কর্তৃক অনুমোদন মিললেই কেবল বালাইনাশক পণ্য হিসেবে মশার কয়েল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ করা যাবে। কিন্তু বাজারের অধিকাংশ মশার কয়েলের পিএইচপি নম্বর থাকলেও বিএসটিআইর অনুমোদন নেই। কোনোটিতে আবার বিএসটিআই অনুমোদন থাকলেও নেই পিএইচপি নম্বর নেই। কোনোটির ক্ষেত্রে আবার ভুয়া পিএইচপি নম্বর দিয়ে অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিএসটিআই সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ৮৩টি কোম্পানি মশার কয়েল উৎপাদনে সংস্থাটির অনুমোদনপ্রাপ্ত।


[bwitSDisqusCom]