সর্ষের মধ্যে ভূত আছে- বিএসটিআই মান রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে

AUTHOR: durnitirsondhane2
POSTED: শনিবার ১৭ অক্টোবর ২০২০at ৫:৩২ অপরাহ্ণ
75 Views

জাহাঙ্গীর আলম,বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশে কোনো পণ্য, সেবা বা প্রক্রিয়ার মান নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ হলো, পণ্যসামগ্রীর মান প্রণয়ন, প্রণীত মানের ভিত্তিতে পণ্যের গুণাগুণ পরীক্ষা, বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত পণ্যগুলো পরীক্ষার পর সনদ দেওয়া ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সার্টিফিকেট দেওয়া। এ ছাড়া ম্যাট্রিক পদ্ধতির প্রচলন, বাস্তবায়নসহ ওজন ও পরিমাপের সঠিকতা তদারক করে বিএসটিআই। অন্যদিকে মানসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্ব করে সংস্থাটি।

অভিযোগ রয়েছে, বৈধ প্রতিষ্ঠানের অবৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে জানলেও নিয়মিত মাসোয়ারা নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না বিএসটিআই। মাঝেমধ্যে মাসোয়ারা আদায়ে অনিয়ম হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে সার্ভিলেন্স টিমের অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতায় আনা হয়। তাছাড়া বৈধভাবে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদে পদে পোহাতে হয় নানা হয়রানি, এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। সর্ষের মধ্যে ভূত আছে। বিএসটিআই মান রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।’এমন অনিয়মে ভরা পরিস্থিতিতে পালিত হলো এবারের বিশ্ব মান দিবস।

জানা গেছে, প্রতিটি থানায় বিএসটিআইয়ের ফিল্ড অফিসার (মাঠকর্মী) রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকিতে থাকার কথা এসব মাঠকর্মীর। এখন নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করা মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব মাঠকর্মীর। চেইন মেনে সে মাসোয়ারার ভাগ যায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত। কোনো কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করা না গেলে পণ্য যতই ভালো হোক মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। টাকার পরিমাণের ওপর পণ্যের মান ঠিক করে বিএসটিআই, এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এমনকি টাকা দিলে নমুনা না দিয়েও ফলাফল পাওয়া যায় বলে অভিযোগ আছে। বৈধভাবে নানা হয়রানি পোহাতে হলেও অবৈধ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সহায়তা করে বিএসটিআই। মাসোয়ারা পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। উল্টো প্রতিবছর এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সভায়ও বসে প্রতিষ্ঠানটি বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘লেনদেনের ওপরেই পণ্যের মান ঠিক হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যখন বসে মিটিং হয়, পরে সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো অভিযান হয় না। এতে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। একই এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান হয়, অন্যগুলো বাদ যায় কেন?

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিএসটিআইয়ের চরম ব্যর্থতার কারণে বাজার ভেজাল ও নিম্নমানের বা মানহীন পণ্যে ভরে গেছে। প্রতিবছর বিশ্ব মান দিবসকে সামনে রেখে অভিযানে নামে বিএসটিআই। এবারও দিবসের কয়েক দিন আগে থেকে প্রশ্নবিদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেছে বিএসটিআই। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় যেমন অভিযান হয়েছে, তেমনি নিজস্ব সার্ভিলেন্স অভিযানও হয়েছে।

জানা গেছে, এসব অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মূলে রয়েছে টার্গেট প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিএসটিআই। অবৈধ ও মানহীন প্রতিষ্ঠানের তালিকা থাকার পরও শুধু মাসোয়ারা না দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ করেই চালানো হয়েছে অভিযান।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেকারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বলেন, ‘তালিকা করে সবার কাছ থেকেই মাসোয়ারা আদায় করে। আপনি যতই ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করেন টাকা ছাড়া সেটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না। আবার লাইসেন্স নিলেন, সেটা নবায়ন করতে হবে। কিছুদিন পরপর সার্ভিলেন্স টিম আসবে। মাসিক একটা মাসোয়ারা দিলে কোনো টেনশন নেই। এমনকি লাইসেন্স না থাকলেও সমস্যা নেই। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান তাই মানসনদ না নিয়েই ব্যবসা করছে।’

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, নির্ধারিত পণ্যের উৎপাদন বা বাজারজাত করার ক্ষেত্রে মান সংস্থা বিএসটিআই থেকে অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। শতভাগ মান নিশ্চিত করা গেলে তখনই মানসনদ পাওয়ার কথা। আবার মানসনদ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেলেও সেটা বিএসটিআইয়ের তদারকিতে থাকার কথা। বাস্তবে মাসোয়ারা আদায় ছাড়া কোনো তদারকি নেই বিএসটিআইয়ের। বিএসটিআইয়ের সনদপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি পদে টাকার লেনদেন করতে হয় বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসটিআই চট্টগ্রামের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘অন্যান্য সময়েও আমাদের অভিযান হয়, ডকুমেন্ট দেখেন সব সময় কমবেশি অভিযান হয়েছে। এবার আমরা একটু আলাদাভাবে করেছি। মাসোয়ারার বিষয়টা আগেও বলেছেন। কে মাসোয়ারা নেয় সেটা বলেন, কে করে?’

তিনি বলেন, ‘অভিযানগুলো যখন হয় তখন সময়স্বল্পতার কারণে হয়তো একটা-দুটার বেশি প্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। আমাদের অফিসের অন্যান্য কাজও থাকে। তবে একেবারেই পাশাপাশি হলে সেখানে যায় না, সেটা মনে হয় ঠিক নয়। তারপরও কোনো একটা নির্দিষ্ট করে বললে আমি সেটার খবর নেব।


[bwitSDisqusCom]