সমালোচনা হবে, তবে শব্দ হবে না — রিন্টু আনোয়ার

AUTHOR: durnitirsondhane
POSTED: সোমবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
342 Views

সমালোচনা হবে, তবে শব্দ হবে নাভাষার মাস ফেব্রুয়ারীতে ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের মুনাফার হার প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় জানানো হয়, তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদের হার হবে ৬ শতাংশ, যা এত দিন ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ ছিল।
ঘটনাটি পেনশনভোগী, দরিদ্র, নিম্নআয় থেকে যতসামান্য জমা করে ভবিষ্যতে কিছু করার আশায় বেঁচে থাকা লাখ লাখ মানুষকে চরম আঘাত করে। অবশ্য সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। খবর হিসেবে হালে পানি পাওয়ার মতো সমাজের গরীব শ্রেণির জন্য। আশ্বাস মতো অর্থমন্ত্রী এ সিদ্ধান্ত হয় তো পাল্টাবেন। কিন্তু, প্রশ্ন অন্যখানে। সরকারের মাথায় কিভাবে আসে এমন কুচিন্তা? এটা জোগান দেয় করা? তা-ও আবার হাজার-হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার, রিজার্ভ চুরি-লুট, খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি-ঘুষের ভরা মৌসুমে! এর আগেও, দফায়-দফায় কমিয়েছে বিভিন্ন ধরনের জাতীয় সঞ্চয়পত্রের লাভ। এছাড়া ব্যাংকগুলোর দরিদ্রবান্ধব সঞ্চয়স্কিম, ওগুলোতো ‘নাই’ করে ফেলা হয়েছে বহু আগেই। সরকার নিজেই ধার দেনা করে চলছে বলে প্রচার এখন তুঙ্গে। গরীব বা সঞ্চয়পত্রে কেনা সাধারণ মানুষকে কোনো সেবা দিতে গিয়ে সরকার এ অবস্থায় পড়েনি। বিদেশে টাকা পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশকে এই গরীবরা নেয়নি। ব্যাংক লুটও তারা করে না। পাচার-ঋণখেলাপিতেও জড়িত নয়। কম খেয়ে কম পরে কিছু সঞ্চয় করে তারা। কতো নির্দয় হলেই এখন সেটার দিকেও হাত বাড়ানো সম্ভব?
একদিকে, যাদের হাতে টাকার থলি তারাই টাকার খোঁজে হয়রান। আরেকদিকে, লুটেরা শ্রেণির একের পর এক রাষ্ট্রীয় অর্থে থাবা। এতে সরকারের খরচ বেড়ে চলছে। আয়-রোজগার কমছে। অভাবের ঘরে আবার চুরি-চেছরামি, লুটপাট, হরিলুট। এসবের সঙ্গে এক ধরনের আপোসরফা করলেও জনগণের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের লাগাম টানার সিদ্ধান্তে অটল সরকার। একজন ব্যক্তির একসঙ্গে সর্বোচ্চ সঞ্চয়ের সীমা টানবে। সরকারের মোটা দাগের সিদ্ধান্ত হচ্ছে- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগসীমায় লাগাম টানা হচ্ছে। এ তিনটি স্কিমে আলাদা একক ও যৌথ বিনিয়োগসীমাও কমানোর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এ তিনটিতে মানুষ সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে থাকে। এর মধ্য দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনায় মানুষকে নিরুৎসাহিত করার সরকারি ইচ্ছাই বাস্তবায়ন হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে সরকার বুঝেশুনেই এটি করছে। পুঁজিবাজারের অবস্থা ভালো না, ব্যাংকে সুদ কম। মানুষ অন্য কোথাও বিনিয়োগ করতে পারছে না। এখন সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগসীমা কমালে মানুষ সঞ্চয়ে ঊৎসাহ হারাবে। মনে হচ্ছে অন্তপ্রাণে সরকার এটিই চায়। সরকারের চাওয়া এখানেই শেষ নয়। চাহিদা মেটাতে মাঝেমধ্যেই হাত দেয় ব্যাংকে। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসের মধ্যে এক বছরের চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। তারপর নতুন আইন করে হাত দিয়েছে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর অর্থে। স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থের স্থিতি ২ লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সরকার স্বশাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে নিয়ে যাওয়ার আইন পাস করেছে। এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শেয়ার পুঁজিবাজারে দেওয়া হচ্ছে ব্যাংকের হারানো তহবিলের ঘাটতি কমাতে। অথচ ব্যাংকের টাকা যারা নিয়ে গেল, তাদের ধরার নাম নেই। এখন সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় দেশের দুর্বল অংশের সঞ্চয়ে হাত দেওয়া হচ্ছে। টাকার খোঁজে দিশেহারা সরকারের পাশে দাঁড়ানোটা সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাদের যেন নৈতিক দায়িত্ব। তাদেরকে যার যা আছে তাই নিয়ে সরকারের পাশে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করা? তাদের তো আছে বলতে জীবনটা। আর কৃপনতা করে যতসামান্য সঞ্চয়। সংখ্যায় অনেক হলেও তারা সংগঠিত নয়। সরকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার মতো জনশক্তি নয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, ব্যাংক মালিক, পরিচালকরা বোঝাপড়ায় শক্তিমান। ভাগবাটোয়ারায় বুঝবান। লুটপাটের টাকায় সেকেন্ড হোমে আরাম-আয়েশ তাদের। ইনডেমনিটির মতো তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে। এর বাইরেও নানান অভয় ও প্রনোদনা রয়েছে তাদের। সরকার সেটার বিহিত না করে হানা দিচ্ছে ক্ষুদ্রদের সঞ্চয়ে।
জনমনের বিভ্রান্তি নিরসনে তাই সরকারের পক্ষ থেকে এখন বলা হচ্ছে- সঞ্চয়পত্রে নয়, সুদ কমানো হয়েছে ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের। ডাকঘরে যে সঞ্চয় ব্যাংক রয়েছে, সেই ব্যাংকের সুদের হার সব ব্যাংকের সুদের হারের সমপর্যায়ে নিয়ে আসতেই এটা করা হয়েছে। কথাটা তো ঠিক, ওটা ব্যাংক। তাও আবার সরকারি ব্যাংক। দেশের অর্থনীতির গতি ত্বরান্বিত করতে সরকার সব ব্যাংকে নয়-ছয় সুদহার কার্যকর করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে সরকার এটা কার্যকর করবে সেটাই তো স্বাভাবিক। ডাকঘর থেকে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের যেমন সঞ্চয়পত্র কেনা যায়, তেমনি ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকেও মেয়াদি হিসাব ও সাধারণ হিসাব খোলা যায়। গোলমালটা বেঁধেছে এখানেই।
সব দেশেই মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে থাকে। বিশেষ করে যখন বাজারে অযৌক্তিকভাবে কোনো পণ্যের দাম বাড়ে, তখন এ মধ্যবিত্তরাই সবচেয়ে বিপদের সম্মুখীন হয়। তারা চাইলেই তাদের আয় হঠাৎ করে বাড়িয়ে তুলতে পারে না। তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট আয় দিয়েই সংসার নির্বাহ করতে হয়। ফলে হঠাৎ করে বাজারে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সে আঘাত প্রথমে এসে লাগে এই মধ্যবিত্তদের গায়ে। গ্রামগঞ্জ, শহরের ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী ও ছোট ছোট চাকরিজীবীর বেঁচে থাকার ভরসার স্থল এই ডাকঘর সঞ্চয়পত্র। এ সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরা অবসরপ্রাপ্ত নারী-পুরুষ, বিধবা মহিলা, কর্মজীবী মহিলা, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ চাকরিজীবী- যারা ‘ট্রাকসেলের’ চালের জন্য লাইনে দাঁড়াতে পারেন না। সরকারের কোনো ভাতার তালিকাতেও নেই। সঞ্চয়পত্রের সুদের টাকায় তাদের সংসার চলে।ছেলে- মেয়েদের স্কুলের বেতন দেয়, ওষুধপত্র কেনে, বাজার-সদাই করে। এরা গরিবও নয়, ধনীও নয়- মধ্য বা নিম্ন মধ্যশ্রেণির। তারা ব্যবসা করতে পারে না, সরকারের কাছে হাতও পাততে পারে না। আবার সবাই শেয়ারবাজারে যায় না, যেতে পারেও না। আবার এই শ্রণির জন্য সরকারের কোনো সাহায্য-প্রকল্পও নেই।
এরপরও তাদেরকে বোঝা মনে করছে সরকার। বোঝা কমাতেই সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তকে সর্বস্বান্তের পথে ঠেলে দেয়া। কিছুদিন আগেও সঞ্চয়পত্রে সঞ্চয় করতে দেশের মানুষকে উৎসাহ দেয়া হতো। এখানে সঞ্চয় করে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তরা বেশ উপকারও পেত। কিন্তু এতে সরকারে থাকা মানুষরূপি কিছু শকুনের চোখ পড়ে ২০১৫ সাল থেকে। তখন থেকে সরকার সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমিয়ে দেয়। ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ কার্যকর করে। এছাড়া, সঞ্চয়পত্রে ১ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি অনলাইন পদ্ধতি চালুর পর চলতি বছরে বিক্রির গতি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে আগেরবারের একই সময়ের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে ৭৩ শতাংশ।
সরকারের টাকার অভাব নেই; অভাব আদায় ব্যবস্থার। ভ্যাটের টাকা অনাদায়ী, সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের টাকা অনাদায়ী, আয়করের টাকা অনাদায়ী, লাখ লাখ প্রাইভেট কোম্পানির অর্ধেকই আয়কর রিটার্ন দেয় না। পোশাক ব্যবসায়ীদের অর্ধেকও রিটার্ন দেয় না। ওইসব টাকা আদায়ের ব্যাপারে শক্ত না হয়ে মধ্যবিত্তকে নরম পেয়ে এমন থাবা কোন ভাবেই মানা যায় না।
ঋণের নামে ব্যাংক লুটকারিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হয় না। শুধু লুটেরাদের থেকে টাকা উদ্ধার করা গেলেই বাংলাদেশের অনেক অর্থনৈতিক সমস্যা দূর হয়ে যায়। জাতিসংঘের হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের করের টাকার ৩৬ শতাংশই বাইরে পাচার হয়ে যায়। সরকারের যদি চিন্তা থাকে সব দিকে চাপিয়ে দিয়ে কম সুদে জনগনকে ব্যাংক এ টাকা রাখার ব্যবস্থা করবে। সেটা নিতান্তই মূর্খের চিন্তা এবং অর্থনীতির বেহাল দশারই ইঙ্গিত। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করে তারা ব্যাংক, লিজিং প্রতিষ্ঠান, মাল্টিপারপাস এবং শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করবে, যাতে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ভালো দেখাবে, পরবর্তী সময়ে এই সকল প্রতিষ্ঠান জনগণের টাকা লুটেপুটে খেতে পারবে এমনটি যারা ভাবছেন, সেটা আরেক অসুস্থতা মানসিকতার পরিচয়।
প্রতিবছর যে হাজার হাজার কোটি টাকা সেকেন্ড হোমের নামে বা বেনামে বিদেশ চলে যাচ্ছে সেগুলোর তুলনায় সঞ্চিত এ টাকা কিছুই না অথচ আমাদের দেশের মূল্যস্ফীতি এখন সাতের উপরে। সরকার চাইলে সব সংস্থার টাকা নিয়ে নিতেই পারে। সেই ক্ষমতা সরকারের আছে। জবাব চাওয়ার সাহস কারো নেই।
অল্প আয়ের মানুষ ও এককালীন পেনশন- ভোগীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল এই সঞ্চয়পত্র। এটির ওপরে হাত না দিলে কি চলতো না? এ ধরনের থাবা ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকলে সরকার আবার শিশুদের স্কুল ব্যাংকিং সঞ্চয়েও দিতে পারবে। কারো বাধা দেয়ার সাহস হবে না। দেশে এখন স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় খুদে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয় দুই বাড়ছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে স্কুল শিক্ষার্থীদের নামে ১৯ লাখ ৮০ হাজার হিসাব খোলা হয়েছিল। এসব হিসাবে এখন সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। এই নাখান্দা টাকায় ছো মারলেও কেউ আটকাবে না কারণ এতে কোনো ঝুঁকি নেই। বড় জোর সরকারের টুকটাক সমালোচনা হবে। তবে, শব্দ হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

rintuanowar@gmail.com


[bwitSDisqusCom]